April 26, 2014

স্পর্শ - Piyali Chakraborty


ফুলেদের কথা পাখিদের কথা 
ব্যাঙ্গমা, ব্যাঙ্গমী আর তেপান্তরের মাঠ 
তোর পৃথিবী এমন নয়, এমন নয় 
হাত বাড়ালেই মিলবে অন্ন, 
পা বাড়ালেই ইস্কুল, খেলার মাঠ

কিন্তু এমন কেন? আমরা তো হাত বাড়ালেই পেয়েছি ইস্কুল, খেলার মাঠ। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে একদিন রবিবারের দুপুরে চান- খাওয়া সেরে শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে, গাড়িতে চেপে, জিনিষপত্র বোঝাই করে বেরিয়ে পড়ে কয়েকজনে । যদিও এটা প্রথমবার নয়, আবার কারুর কারুর কাছে প্রথম । গাড়িগুল এসে থামে সেকেন্দ্রাবাদের একটা সরু গলির মধ্যে। একটা থামওয়ালা পুরোন হলদেটে বাড়ি। এইরকম স্কুলবাড়ির নাম হতে পারত ‘বিবেকানন্দ আদর্শ বিদ্যামন্দির’ অথবা নিদেনপক্ষে ‘মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয়’, এর ইঁট-সিমেন্টে ভেসে বেড়াতে পারত ঘামে ভেজা কলারের বা ভিজে চুলে বেনী বাঁধার স্মৃতি, হতেই পারত এইসব নামের এক একটা ফেসবুক গ্রুপ, বিস্তর অনলাইন আড্ডা। কিন্তু ওই যে বললাম ‘তোর পৃথিবী এমন নয়, এমন নয়’, তাই এর নাম ‘অমন বেদিকা ফর বয়েজ’।

ঠিক রেললাইনের পাশে, উঁচু, নিচু বাড়ির কার্নিশে তখন খেলা করছে পড়ন্ত রোদ, সেই হলদে বাড়ির উঠোন থেকে ‘দিদিমনিদের’ ডাকে পিলপিল করে বেড়িয়ে এল ওরা, বুকের কাছে জড়ো করা হাত, চোখের কোণে হাসি, আর ঠোঁটের কোণে লজ্জা। বয়স ৪-১০ এর মধ্যে। এদিকে আমরা চিন্তায় ‘ওরা আমাদের ভাষা বুঝবে?’ পৃথিবীতে একটা নীরব ভাষা আছে, তার নাম ‘ইশারা’আর একটা খুব সহজ ভাষা আছে ‘হাসি’, তাই দিয়ে শুরু হল কথোপকথন। বেশ পরিস্কার ইংরিজিতে ওরা একে একে পরিচয় দিল নিজের ‘আই অ্যাম শঙ্কর, সাহিল, শেখর, ক্লাস টু,থ্রি,ফোর’, কেউ পুলিশ, ডাক্তার, বৈজ্ঞানীক হতে চায়। তারপর একটা করে ছবি, ওদের একসাথে চেঁচিয়ে ওঠা ‘সান’, ‘ডগ’, ‘বার্ড’। একবার অন্য এক রাজ্যের এক প্রাইমারি স্কুলের পাশ দিয়ে যেতে যেতে শুনেছিলাম সেখানকার বাচ্চারা একসাথে চীতকার করছে। ভাষা বদলে যায়, পাড়া বদলে যায়, স্কুল বদলে যায়, কিন্তু বাচ্চাদের চীতকারের সুর বদলায় না। তার ভাষা নেই, পাড়া নেই, স্কুল নেই। লজেন্স পেলে ওরা সবাই একিরকম খুশি হয়, ফেলে, ছড়িয়ে, কুড়িয়ে খেয়ে ফেলে কেক, ছোট্ট দুটো হাতের চেটোয় সাবধানে আগলে রাখে টুকরোটা।একটা লজেন্স শেষ করে লাজুক চোখে তাকায়, আরেকটা এগিয়ে দিলে ছোট্ট মুঠি খুলে হাসে। ওরা যখন একেবারে ছোট ছিল, তখন কেউ ওদের এমন মুঠি খুলে ভিক্ষা চাইতে শিখিয়েছিল, ওদের কাছে ‘হাত বাড়ালে মিলবে ভিক্ষে, পা বাড়ালে এক গলি থেকে অন্য গলি, কানাগলি’, এক হাত থেকে অন্য হাত, তারপর কোনভাবে ঘুরে- ফিরে আজকের এইটুকু আস্তানা, সমাজের মূল স্রোতে ফেরার চেষ্টা। আমরা তাই আর আলাদা করে জানতে চাইনা ওদের গল্পটা, আমরা জানি তো

তোর স্বদেশ এমন পোড়া দেশ 
একটি শিশু জন্মালে তার জন্য রয়েছে খোলা ফুটপাথ
মাথার ওপর উলঙ্গ আকাশ ।


এরপর ছবি, একটা ছবি দেখে চোখে ফেট্টি, হাতে চক, আঁক দেখি মনে করে। ইচ্ছে করে ওদের ওই অন্ধকারে ডুব দিয়ে খুঁজে বার করি ছবিটার মানে। ওদেরও কি আছে নাকি জুতোর বাক্সে লুকিয়ে রাখা ব্যাং, ছেঁড়া চপ্পল, দেশলাই বাক্সের কালেকশন, কাগজ কেটে ট্যারা ব্যাঁকা ফুল পাতা? নিশ্চই আছে, তাই তো ওরা চোখ বেঁধে দিলে খুঁজে ফেরে শৈশবের ধন আর আঁকতে আঁকতে কারুর বিড়ালের ল্যাজ হয়ে যায় লম্বা, ফ্যানের থেকে বেরিয়ে আসে ফ্যানের ব্লেড, মেঘ হয়ে যায় আইস্ক্রিমের বল। ওরা হাসে, আমরাও হাসি।

স্কুলবাড়ির পিছন দিকে ওদের থাকার ঘর, দুটো মাঝারি ঘরের মেঝে বিছানা পেতে, এক একটায় তিরিশ জন করে শোয়। ওদের ঘরে ঢুকে মনে মনে বলি ‘আমি আর নালিশ করব না, সব নালিশ তোলা থাক ওদের জন্য’। ওরা কিন্তু একবারও নালিশ করেনি জানেন।

দারুণ গ্রীষ্মে তোর শরীর পুড়বে 
দারুণ বর্ষায় তোর শরীর ভিজবে
আর দারুণ শীতে, তোর ছোট ছোট হাতে পায়ে
কাঁপতে থাকবে তোর ছোট্ট শরীর
আর তোর দিকে মুখ ফিরিয়ে 
উদাসী হেঁটে যাবে জগত সংসার।

ওদের ছবি আঁকা শেষ হয়, ওরা নাচে, গান গায়, ছবি তোলে। আর আমাদের দেওয়া, ব্যাগ, থালা, বাটি, চামচ, খাতা পেন্সিল পেয়ে বেজায় খুশি হয়। সাদা কাপড়ে আলো ফেলে দেখান হল একটা ভিডিও, ওদেরি মত একদল বাচ্চা ওদের সম্পর্কে কতকিছু বলে, ওরা কিছু বোঝে, কিছু বোঝে না শুধু ওদের দেখে হাসে, আর হাসির যে ভাষা নেই, আলাদা করে বোঝার কিছু নেই।

সন্ধ্যে নেমে গেছে, আমরা ফিরব এবার। ওরা আব্দার করে ‘দিদি ফির সে আনা’, ‘দাদা ফির সে আনা’। আমরা প্রতিশ্রুতি দি, হ্যাঁ আসব,

একটি শিশু, সোনার থালা 
মিথ্যে কথা, অলীক প্রতিশ্রুতি 
সবকিছুই কি অলীক? বেরিয়ে আসতে আসতে মনে হয়

ওদের মত করে লিখতে পারব না, গভীর রাতে ট্রেনের শব্দে মেঝে কেঁপে উঠলে, তিরিশ জনের নিঃশ্বাসে ঘর গুমোট হলে, ঘামে ভিজে যাওয়া বালিশ, বিছানা, অন্ধকারে ভুত-প্রেতের স্বপ্ন, গলা শুকিয়ে কাঠ। তবু ইচ্ছে আছে, বাঁচার, স্বপ্ন দেখার, পড়ার, আঁকার, নাচের আর আমরা সেইটুকুকে একটু স্পর্শ করেছি মাত্র।

স্পর্শ’ বেঙ্গলিজ ইন হায়দ্রাবাদের স্পর্শ। কখনও সুযোগ হলে করে দেখবেন, বেশ লাগে। আবার দেখা হবে এমনই একঝাঁক স্বপ্নের সাথে ‘হয়ত অন্য কোথাও, হয়ত অন্য কোনখানে’।

(কবিতার উদ্ধৃতি নেওয়া হয়েছে কবিতা-স্বরবর্ণ, রচনা- পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়)
_____________________________________________________________________________


Piyali Chakraborty
About the author: Piyali Chakraborty in working in an MNC in Hyderabad. She has done her graduation from DA college, Kolkata and mass communication from Jadavpur University. She loves reading books and writing too. Her write ups have been published in magazines and recently one book, ঠিক যতটা Short Film, has been published. She also participated in many stage shows, dramas. Her hobby is Recitation and she is actively attached with Bengalis In Hyderabad from last 2 years.





--------------------------------------------------------------------------------------------

-------------------------------------------------------------------------------------------
Follow Us:

No comments:

Post a Comment